মহাবিশ্বের সৃষ্টি হলো কিভাবে? বিগব্যাং

26

বিজ্ঞানে সবকিছুই শুরুতে অনুমান থাকে। তারপর শুরু হয় তার প্রমাণ (Evidence)-এর খোঁজ। যত বেশী evidence পাওয়া যায়, অনুমানটি তত শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায় এবং আমরা তাকে ততই প্রকৃত সত্যের কাছাকাছি মনে করতে পারি। যেমন- ‘ইলেকট্রন’ কেউই স্বচক্ষে দেখেনি (দেখলেই বা কী! মানুষের চোখকে বিশ্বাস আছে?) কিন্তু হাজারো পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখা যায় ইলেকট্রন (যদি তা থেকে থাকে) ঠিক তেমনই আচরণ করে যেমনটা তত্ত্ব বলে তাই ইলেকট্রন এখন আমাদের কাছে একটা বাস্তব জিনিস যার অস্তিত্ব নিয়ে বিশ্বে কারও মনে কোনও সন্দেহ নেই।

বিগব্যাং-এর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা গত এক শতাব্দী ধরে দিনরাত এক করে ফেলেছেন এবং তার ফলে যা জ্ঞান লব্ধ হয়েছে তার থেকে আমরা বলতে পারি- বিগ ব্যাং সত্যিই ঘটেছিল। এটা পরম সত্য। তবে হ্যাঁ, এটাও আমরা জানি, বিগব্যাং সম্পূর্ণ সত্য নয়, এটা সৃষ্টির আদি কারণও নয় বরং সৃষ্টির অব্যবহিত পরেই ব্রহ্মাণ্ড কীরূপ আচরণ করেছিল তার বর্ণনা। এর সাথে আরও অনেক জানা/অজানা বিষয় রয়েছে যেগুলো বিনা মহাবিশ্ব আজকের রূপে এসে পৌঁছাতে পারত না। সেই সাথে এটাও আমরা জানি যে- মহাবিশ্ব কীভাবে শুরু হল অর্থাৎ সৃষ্টি কীভাবে হল সেটা আমরা জানি না। সৃষ্টির এক্কেবারে প্রথম অবস্থাটা নিয়েও আমরা নিশ্চিত নই।

এবারে সামান্য বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

ব্রহ্মাণ্ড প্রসারণের কাহিনীঃ

এই গল্প শুরুর আগে ছোট্ট করে আমরা জেনে নেই ‘ডপলার অভিক্রিয়া’ (Doppler effect) ব্যাপারটা কী।

স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকলে যখন একটি ট্রেন আসতে থাকে, তখন তার সাইরেনের আওয়াজকে উচ্চগ্রামের (Higher pitch) শোনায়। যখন সেটি আমাদের পেরিয়ে চলে যেতে থাকে, সাইরেনের আওয়াজ তখন নিম্নগ্রামের (Lower pitch) শোনায়। pitch নির্ভর করে শব্দের কম্পাঙ্কের (Frequency)-র ওপর। আবার কম্পাঙ্ক নির্ভর করে শব্দের উৎস ও শ্রোতার আপেক্ষিক বেগের ওপর। শব্দের উৎস আপেক্ষিকভাবে শ্রোতার দিকে আসতে থাকলে শব্দের কম্পাঙ্ক আপাতভাবে বৃদ্ধি পায় আর শব্দের উৎস আপেক্ষিকভাবে শ্রোতার থেকে দূরে সরে যেতে থাকলে কম্পাঙ্ক আপাতভাবে হ্রাস পায়। এই ঘটনাকে বলে ‘ডপলার অভিক্রিয়া’।

একই ধরণের ঘটনা পরিলক্ষ্যিত হয় আলোর ক্ষেত্রেও (যদিও দৈনন্দিন জীবনের নিম্ন গতিতে তা চোখে ধরা দেয়না)। এক্ষেত্রে আলোর উৎস আপেক্ষিকভাবে দর্শকের দিকে আসতে থাকলে আলোর কম্পাঙ্ক আপাতভাবে বৃদ্ধি পায় আর উৎস আপেক্ষিকভাবে দর্শকের থেকে দূরে সরে যেতে থাকলে কম্পাঙ্ক আপাতভাবে হ্রাস পায়।

তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালীর ‘দৃশ্যমান’ অঞ্চলে বেশী কম্পাঙ্কের দিকটি হল ‘নীল’ এর দিক এবং কম কম্পাঙ্কের দিকটি হল ‘লাল’ এর দিক। তাই আলোর ডপলার অভিক্রিয়ায় কম্পাঙ্ক বেড়ে যাওয়াকে ‘নীলসরণ’ (Blue shift) ও কম্পাঙ্ক কমে যাওয়াকে ‘লালসরণ’ (Red shift) বলে। অর্থাৎ একটি আলোকউৎস উচ্চবেগে দর্শকের কাছে আসতে থাকলে তাকে যেন স্বাভাবিকের তুলনায় একটু নীলচে দেখায় এবং উৎস উচ্চবেগে দর্শকের থেকে দূরে সরতে থাকলে তাকে যেন স্বাভাবিকের তুলনায় একটু লালচে দেখায়।

এখানে ডপলার সরণ হচ্ছে আপেক্ষিক গতির জন্য। আরও একভাবে ডপলার সরণ হতে পারে। যদি উৎস ও দর্শক উভয়েই স্থির থাকে কিন্তু তাদের মধ্যবর্তী স্থানটিই প্রসারিত/সঙ্কুচিত হতে থাকে তবে উৎস থেকে নির্গত ও সেই প্রসারণশীল/সংকোচনশীল স্থানের মধ্য দিয়ে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যও প্রসারিত/সঙ্কুচিত হবে অর্থাৎ কম্পাঙ্ক কমবে/বাড়বে ফলে ‘লালসরণ’/’নীলসরণ’ হবে।

চিত্রঃ যদি বিশ্বে একটি নীল আলো থাকে এবং বিশ্ব প্রসারিত হয় তবে নীল আলোর লালসরণ হয়

[তৃতীয় একটি বিকল্পও আছে যেটা মহাকর্ষের জন্য হয় কিন্তু এই উত্তরে এটি উহ্য রাখছি]

এবারে মহাবিশ্বের কথায় আসা যাক।

১৯১৬ সালে আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত ‘সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ’ প্রকাশ করেন। এতে তিনি দেখান কীভাবে স্থানকালের জ্যামিতিক গঠনের সাহায্যে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করা যায়। এতে সৌরজগত সম্পর্কিত মহাকর্ষীয় পদার্থবিদ্যার অনেক দীর্ঘকালীন জটিল সমস্যার সমাধান হয় এবং এই তত্ত্ব পদার্থবিদ্যায় স্থায়ী আসন লাভ করে।

এরপর ১৯১৭ সালে আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে মহাবিশ্বের ওপর প্রয়োগ করেন। তার ফলে মহাবিশ্ব সংক্রান্ত যে গাণিতিক সমাধান তিনি পান তাতে দেখা যায় মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইন স্থির মহাবিশ্বে বিশ্বাসী ছিলেন ফলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। নিজের তত্ত্বকে বিশ্বাস করতে না পেরে তিনি তার মধ্যে জোর করে একটু গাণিতিক জোড়াতালি দেন এবং তাঁর ক্ষেত্র সমীকরণে একটি অতিরিক্ত পদ যোগ করেন। এই পদটি প্রসারণের বিপরীতে কাজ করে প্রসারণকে আটকে রাখে। তিনি এর নাম দেন ‘মহাজাগতিক ধ্রুবক’ (Cosmological constant)।

১৯২২ সালে এই একই বিষয় নিয়ে কাজ করেন আলেকজান্ডার ফ্রীডম্যান নামে এক গণিতজ্ঞ ও পদার্থবিদ। তাঁর গণিত থেকে দেখা যায় সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী অবস্থার ভিত্তিতে মহাবিশ্বের স্থিতি, সংকোচন ও প্রসারণ- তিনকরম অবস্থাই হতে পারে। আইনস্টাইন তাঁর কাজকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি।

১৯২৭ সালে জর্জ লেমাইত্রে নামে আর একজন পাদ্রী ও পদার্থবিদ এই বিষয়ে কাজ করেন। তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতা প্রয়োগ করে দেখাতে সমর্থ হন যে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। তারাজগতগুলির সরণের হারের একটি গাণিতিক সূত্রও তিনি বের করেন। তিনি যখন তাঁর কাজ আইনস্টাইনকে দেখান, আইনস্টাইন মন্তব্য করেন, “আপনার গণিতটা তো ঠিকই আছে কিন্তু আপনার পদার্থবিদ্যাটা চূড়ান্ত জঘন্য”। তিনি প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন তবে তিনি লেমাইত্রের কাজের বেশ কিছু অংশ নিয়ে সহমত ও সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং নিজের কাজের মধ্যেকার কিছু ত্রুটি মেনে নেন। তবে লেমাইত্রেকে অন্যধরণের মহাবিশ্বের মডেল সম্ভাব্য কিনা সেটা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেন।

১৯২৮ সালে রবার্টসন নামে আরও একজন গণিতজ্ঞ ও পদার্থবিদ সাধারণ আপেক্ষিকতাকে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখান মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। তিনি এর জন্য তারাজগতগুলির আলোর যে ডপলার ‘লালসরণ’ হবে তা গণনা করেন।

ব্রহ্মাণ্ড প্রসারণে বহুদূরবর্তী তারাজগতের আলোর (তরঙ্গদৈর্ঘ্যের) প্রসারণ ঘটে ও লালসরণ হয়

কীভাবে জানা যায় যে মহাবিশ্ব প্রসারণের এই তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক কিনা?- যদি তারাজগতগুলির সত্যিই লালসরণ হচ্ছে কিনা এবং হলে কতটা হচ্ছে তা পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের সাহায্যে জানা যায়।

১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবল পর্যবেক্ষণের সাহায্যে অন্যান্য তারাজগতের ডপলার সরণ পরিমাপ করেন। দেখা যায় প্রায় সমস্ত তারাজগতের ক্ষেত্রে উচ্চমানের ‘লালসরণ’ হচ্ছে এবং এর থেকে প্রসারণের যে হার পাওয়া যায় তা তত্ত্বের থেকে পাওয়া প্রসারণ হারের সূত্রের সাথে মিলে যায়।

এর থেকে বোঝা যায় প্রায় সমস্ত তারাজগত আমাদের থেকে বিপুলবেগে দূরে সরছেএবং এই সরণের জন্য দায়ী তাদের নিজেদের স্থানের মধ্য দিয়ে চলন নয় বরং স্থানের নিজেরই প্রসারণ কারণ হাবল-লেমাইত্রে সূত্র অনুযায়ী এই সরার হার দূরত্বের সাথে সমানুপাতিক অর্থাৎ যে যত দূরে অবস্থিত সে তত দ্রুত দূরে সরছে। তারা নিজেরা চললে এটা দূরত্বের ওপর নির্ভরশীল হত না- সবাই সমানবেগে সরত। তাই আসলে স্থান নিজেই বাড়ছে অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে।

চিত্রঃ বলরূপী স্থানের প্রসারণে বিটলরূপী তারাজগতগুলি দূরে সরতে থাকে এবং যে যত দূরে থাকে সে তত দ্রুত আরও দূরে সরে

এই আবিষ্কারের পর আইনস্টাইন প্রসারণশীল মহাবিশ্বের তত্ত্ব মেনে নেন; তাঁর সমীকরণ থেকে ‘মহাজাগতিক ধ্রুবক’টিকে তিনি সরিয়ে দেন এবং বলেন এটা ছিল তাঁর জীবনের “বৃহত্তম ভুল”। ১৯৩৩ সালে যখন লেমাইত্রে CalTech এর একটি বিজ্ঞানসভায় তাঁর তত্ত্ব বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত করেন, তখন আইনস্টাইন নাকি উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেন এবং বলেন “এটা আমার শোনা সৃষ্টির সবচেয়ে সুন্দর এবং সন্তোষজনক ব্যাখ্যা”।

এর পরেও ফ্রেড হয়েল-এর মত বিখ্যাত পদার্থবিদরা প্রসারণশীল মহাবিশ্বের চরম বিরোধিতা করেন। ব্রহ্মাণ্ড প্রসারিত হয়ে থাকলে নিশ্চয় একটা খুব ঘন অবস্থা থেকে তা শুরু হয়েছে একটা ‘বিস্ফোরণ’ এর আকারে। হয়েল তো ঠাট্টা করে একে বলে বসলেন ‘Big Bang’। অথচ এই হয়েলই ওয়াগনার ও ফাউলারের সাথে মিলে দেখালেন বিগ ব্যাং এর কয়েক মুহূর্ত পর প্রচণ্ড উষ্ণতায় যে নিউক্লীয় ফিউশন ঘটেছে তার ফলে ব্রহ্মাণ্ডের ২৫% পদার্থ হিলিয়াম তৈরি করেছে; বাকীটা হাইড্রোজেন হিসেবে রয়ে গেছে। আরও ভারী মৌলগুলো ভবিষ্যতে তৈরি হয়েছে। পর্যবেক্ষণের ফলাফল এইসব অনুমানের সাথে মিলেও গেল।

তাতে কিন্তু হয়েল প্রসারণশীল মহাবিশ্বের বিরোধিতা করা থামালেন না। হাবলের ফলাফল বজায় রেখেও স্থিতিশীল মহাবিশ্ব হতে পারে এটা দেখানোর জন্য বিগব্যাং -এর বিরোধী তত্ত্ব হিসেবে হয়েল, বন্ডি ও গোল্ড দিলেন মহাবিশ্বের ‘স্থির দশা মডেল’ (Steady state model)। এতে তাঁরা বললেন, মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু একইসাথে মহাবিশ্বে প্রতিনিয়ত নতুন পদার্থ জন্ম নিচ্ছে ফলে মহাবিশ্ব দেখতে সর্বদা একইরকম থাকছে- এর ঘনত্ব পরিবর্তন হচ্ছে না।

কিন্তু পর্যবেক্ষণ এই মডেলকে সমর্থন করল না। ব্রহ্মাণ্ডের সুদূরতম প্রান্তে আবিষ্কৃত হল বিশেষ ধরণের কিছু প্রাচীন মহাজাগতিক বস্তু যাদের বলে- রেডিও গ্যালাক্সি ও কোয়াসার। আমাদের গ্যালাক্সির কাছাকাছি এইরকম বস্তু পাওয়া যায়না। ফলে স্থিরদশা মডেলের বক্তব্য ‘মহাবিশ্ব সময়ের সাথে সাথে বদলাচ্ছে না’- নাকচ হয়ে গেল কারণ তা হলে মহাবিশ্বের সর্বত্রই এই ধরণের বস্তু থাকত।

আদিলগ্নের কাহিনীঃ

মহাবিশ্ব প্রসারণশীল না স্থিতিশীল সেই নিয়ে লড়াই চলার সময়েই বিজ্ঞানীরা পাশাপাশি ভাবতে বসলেন মহাবিশ্ব যদি প্রসারণশীলই হয়, তবে তা কি আমাদের আর কিছু জানায়?

শোয়ার্জচাইল্ড, রায়চৌধুরী, কোমার, শেপলে, পেনরোজ, এলিস, হকিং ও গেরোচ-এর মত বহু তাত্ত্বিক মহারথীদের কয়েকদশকের প্রচেষ্টায় জানা গেল কিছু অভূতপূর্ব বিষয়। বিশাল ভরের অত্যন্ত ঘনীভূত বস্তু নিজেরই প্রচণ্ড শক্তিশালী মহাকর্ষের প্রভাবে নিজের মধ্যেই ক্রমশ চুপসে গিয়ে সৃষ্টি করে কৃষ্ণগহ্বরের মত বস্তু (Black hole) যার কেন্দ্রস্থলকে বলে ‘অনন্যতা বিন্দু’ (Singularity)। এর মধ্যে হকিং-এর কাজ থেকে জানা গেল সম্পূর্ণ মহাবিশ্বের কথা চিন্তা করলে এই একই প্রভাব সময়ের উলটোদিকেও ঘটতে পারে। অর্থাৎ সহজ ভাষায়, মহাবিশ্ব যেহেতু সময়ের সাথে সাথে প্রসারিত হচ্ছে তাই সময়ের উলটোদিকে গেলে এটি সঙ্কুচিত হবে এবং শেষপর্যন্ত সময়ের শেষপ্রান্তে অর্থাৎ সৃষ্টিলগ্নে এটি কৃষ্ণগহ্বরের মতই একটি Singularity সৃষ্টি করবে। অর্থাৎ আজকের এই মহাকায় ব্রহ্মাণ্ড একদিন একটিমাত্র অসীম ঘনীভূত বিন্দু থেকে শুরু হয়েছিল। হিসেব করে জানা গেল এই অবস্থা ছিল আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে।

এর কাছাকাছি সময়েই স্থিরদশা মডেলের বিরুদ্ধে আবার বিগব্যাংভিত্তিক তত্ত্ব দিলেন আলফার, হারমান ও গ্যামো। তাঁরা বললেন যদি বিগ ব্যাং ঘটেই থাকে, তবে সৃষ্টির আদিলগ্নে সমগ্র স্থানজুড়ে এক বিশেষ ধরণের বিকিরণ নিঃসরণ হওয়ার কথা। একে বলা হল ‘মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পশ্চাৎপট বিকিরণ’ (Cosmic Microwave Background Radiation বা CMB)।

সত্যিই কি CMB আছে?

হ্যাঁ। আছে! এই বিকিরণ খুঁজে পেলেন পেনজিয়াস ও উইলসন। বিশেষ যন্ত্রে দেখা যায় আমাদের চতুর্দিকে সমস্ত জায়গায় সত্যিই ছড়িয়ে আছে এক শীতল বিকিরণ যার উষ্ণতা সমস্ত অঞ্চলে ও সমস্ত দিকে প্রায় সমান। TV তে সিগন্যালহীন চ্যানেলে যে অজস্র বিন্দু এলোমেলোভাবে নাচতে থাকে তার একটা অংশ হল এই মাইক্রোওয়েভ পশ্চাৎপট। অত্যন্ত সমসত্ত্ব এই বিকিরণ হল সৃষ্টির আদিলগ্নে বিগব্যাংএর ফলে জন্ম হওয়া এক বিকিরণ। ব্রহ্মাণ্ডের জন্মের এক আদিম ফসিল।

NASA উপগ্রহ চিত্রে পশ্চাৎপট বিকিরণের অঞ্চলভেদে উষ্ণতার তারতম্য বিভিন্ন রঙে দেখানো হয়েছে (দেখা যায় এই তারতম্য স্থানভেদে অত্যন্ত ক্ষুদ্র)। তবে অন্য পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায় কালভেদে এই বিকিরণের উল্লেখযোগ্য উস্নতার তারতম্য রয়েছে (অতীতে অনেক বেশী উষ্ণ ছিল- এটিও সেই আদিম এক মহাবিস্ফোরণের সাক্ষ্য দেয়)

এইভাবে শতাব্দীব্যাপী অনেক গবেষণা ও আবিষ্কারে এটা নিশ্চিত হয়েছে যে মহাবিশ্ব ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি বিন্দু অবস্থা থেকে বিগব্যাং এর মাধ্যমে শুরু হয়ে মহাপ্রসারণের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থায় এসেছে এবং এই প্রসারণ আজও চলছে (এবং তা ক্রমশ আরও দ্রুত হচ্ছে!– কীভাবে সে অন্য কাহিনী)।

কীভাবে এই মহাপ্রসারণ শিশু মহাবিশ্বকে আজকের রূপে পর্যবসিত করল, কীভাবে প্রথমে মূলগত কণা (elementary particles), তারপর জটিল কণা (composite particles), সেই থেকে একে একে পরমাণু, অণু, তারা, গ্রহ, গ্যালাক্সি এবং শেষপর্যন্ত প্রাণ গড়ে উঠল সেও আলাদা এক বিরাট কাহিনী। সেটা লিখতে গেলে আর উত্তর শেষ হবেনা। আরেকদিন সেই গল্প বলব। Stephen Hawking এর ‘Into the Universe with Stephen Hawking’ ডকুমেন্টারি ফিল্মের প্রথম পার্ট ‘The story of everything’ টি দেখতে পারেন। যদি সৃষ্টির পরের ৩ মিনিটের কথা বিশদে জানতে আগ্রহী হন (এই সময়টুকু মহাবিশ্বের শৈশবের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়) তবে নোবেলজয়ী পদার্থবিদ Steven Weinberg এর লেখা ‘The first three minutes’ বইটি পড়তে পারেন।

সৃষ্টির কাহিনীঃ

প্রসারণের কাহিনী হল। সেই থেকে সৃষ্টির ঊষালগ্নের বিন্দুদশার কাহিনীও জানা গেল। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল এই বিন্দুদশা কীভাবে সৃষ্টি হল? ওই বিন্দু একদম শুরুতে কীরকম অবস্থায় ছিল? আর সেই বিন্দুদশা কেনই বা বিগব্যাং-এর মধ্য দিয়ে প্রসারণ শুরু করল?

বলা বাহুল্য, এই প্রশ্নগুলি এখনও বিশ্বতত্ত্ব (Cosmology)-র সমাধানহীন প্রশ্ন। এই নিয়ে সারা বিশ্বে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। ব্রহ্মাণ্ড কীভাবে শুরু হল (আদৌ কি এর শুরু আছে?) সেই প্রশ্ন না হয় আজ আলমারিতে তোলা থাক (বিজ্ঞানীরা আগে জানুন, তারপর আমরা জানব!)। তবে শেষ প্রশ্নটির উত্তর মিলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কীভাবে প্রসারণ শুরু হল তার ব্যাখ্যা হিসেবে এসেছে ‘মহাজাগতিক মহাস্ফীতি তত্ত্ব’ (Cosmic Inflation theory)। এই মহাস্ফীতি বিগব্যাং-এর একেবারে প্রথম মুহূর্তে, মহাপ্রসারণের ঠিক আগে ঘটেছিল বলে মনে করা হচ্ছে। কীভাবে এটি শুরু হল তত্ত্বে তাও বর্ণিত হয়েছে। এই তত্ত্ব সঠিক কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়। এখানে আর সেই আলোচনায় যাচ্ছি না।